বুদ্ধবংশ খুদ্দকনিকায়ে
অনুবাদক: শ্রীমৎ ধর্মতিলক স্থবির
চঙ্ক্রমণ নির্মাণ প্রণালি
অজ্ঞানতম বিনাশক মহা মহীয়ান লোকগুরু ভগবান সর্বজ্ঞ বুদ্ধ বিংশতি সহস্র ক্ষীণাসব শিষ্য পরিবৃত হইয়া, শুদ্ধোদন মহারাজের আমন্ত্রণে কপিলবাস্তু নগরীতে পদার্পণ করিয়াছিলেন। তিনি তথায় রমণীয় ন্যাগ্রোধ আরামের রত্নচঙ্ক্রমণে অবস্থানকালীন তাঁহার জ্ঞাতিগণের অভিমান নষ্ট করিবার জন্য, তদীয় অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র মহাস্থবিরের দ্বারা প্রার্থিত হইয়া শ্রোতৃগণের প্রসাদজনক এই ‘বুদ্ধবংশ’ দেশনা করিয়াছিলেন। তাহা মহাকাশ্যপ স্থবির প্রমুখ ধর্মসংগ্রাহক সঙ্গীতিকারক স্থবিরগণ (বুদ্ধবংশ) জনসাধারণের মধ্যে প্রকাশ করিতে ‘ব্রহ্মা চ লোকাধিপতি সহম্পতি’ ইত্যাদি বলিয়া আরম্ভ করিয়াছিলেন।
১. লোকাধিপতি সহম্পতি মহাব্রহ্মা কৃতাঞ্জলিপুটে সর্বজ্ঞ বুদ্ধের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে, ভগবান, ইহলোকে অল্পক্লেশ প্রকৃতি জীবগণ আছে, আপনি জগদ্বাসী প্রাণীদের প্রতি করুণা করিয়া চারি আর্যসত্যধর্ম দেশনা করুন।
২. আট প্রকার বিদ্যা ও পনেরো প্রকার আচরণসম্পন্ন, হিতাহিত বিষয়ে এক সমান গুণযুত জ্যোতিষ্মান অন্তিম দেহধারী ও অসদৃশ পুরুষ তথাগত বুদ্ধের জন্ম-জরাদি-দুঃখপ্রাপ্ত প্রাণীদিগের প্রতি করুণার উদয় হইয়াছিল।
৩.৪. করুণা উদয় হইয়াছিল কেন?] যেহেতু এই মনুষ্যগণ অর্থাৎ শুদ্ধোধন মহারাজ প্রমুখ বুদ্ধের জ্ঞাতিগণ এই নরশ্রেষ্ঠ বুদ্ধ কীদৃশ লোক-হিতৈষী, বুদ্ধের ঋদ্ধিবল, প্রজ্ঞাবল এবং দশবিধ জ্ঞানবল কী প্রকার জানে না, যেহেতু ইহারা এই নরোত্তম বুদ্ধ ঈদৃশ, জগতের মঙ্গলময় বুদ্ধের ঋদ্ধিবল, প্রজ্ঞাবল ও বুদ্ধানুভাব এই প্রকার বলিয়া জানে না।
৫. তদ্ধেতু আমি অনুত্তর বুদ্ধবল তাহাদিগকে দেখাইব, আকাশে রত্ন-প্রতিমণ্ডিত চঙ্ক্রমণ নির্মাণ করিব।
৬. তখন ভূমি, চতুর্মহারাজিক, তাবতিংস, যাম, তুষিত এবং ব্রহ্মলোকবাসী দেবগণ উৎফুল্ল হইয়া বিপুল আনন্দধ্বনি করিল।
৭. অতঃপর ভগবান অবদাত-কৃৎস্নের প্রভাবে দশ সহস্র চক্রবাল আলোকিত হউক বলিয়া অধিষ্ঠান করিলেন। সেই অধিষ্ঠানক্ষণেই পৃথিবী হইতে অকনিষ্ঠ ব্রহ্মলোক পর্যন্ত আলোকিত হইয়াছিল। তজ্জন্য গাথায় ‘ওভাসিতা চ পঠবী সদেবকা’ ইত্যাদি বলা হইয়াছে। যখন বুদ্ধ জগৎ আলোকিত করিয়াছিলেন, তখন সেই আশ্চর্যজনক ঋদ্ধির দ্বারা দেবলোক আর পৃথিবী আলোকিত হইয়াছিল। বিস্তৃত অতল লোকান্তরিক নরকের ঘনান্ধকারও বিগত হইয়াছিল।
৮. দেব-গন্ধর্ব-মনুষ্য-রাক্ষসসহ ইহলোকে পরলোকে এবং ইহ-পর উভয় লোকে, নিম্নে অবীচি, ঊর্ধ্বে ভবাগ্র, আর প্রস্থে দশ সহস্র চক্রবাল অবধি বিস্তৃত অন্ধকার বিধ্বংস করিয়া, অপরিমিত মহা আলোক উৎপন্ন হইয়াছিল।
৯. জীবশ্রেষ্ঠ, অদ্বিতীয়, জ্ঞানী, বিনায়ক শাস্তা দেবমনুষ্যদিগের দ্বারা পূজিত হইয়াছিলেন। অতঃপর মহানুভাবসম্পন্ন, শতপ্রমাণ ধন্য-পুণ্য লক্ষণযুক্ত সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী বুদ্ধ দেবমনুষ্যদের বিস্ময়কর প্রতিহার্য বা ঋদ্ধি প্রদর্শন করিয়াছিলেন!
১০. তখন দেবশ্রেষ্ঠ মহাব্রহ্মের দ্বারা প্রার্থিত হইয়া রত্নচঙ্ক্রমণে উপবেশন করে শ্রোতৃবৃন্দের অভিপ্রায়ানুযায়ী ধর্মদেশনা করিবার জন্য লোকনায়ক চক্ষুষ্মান নরোত্তম বুদ্ধ জগতের মঙ্গল দর্শনে তথায় সর্বরত্নময় চঙ্ক্রমণ সুন্দরাকারে নির্মাণ করিয়াছিলেন।
১১. একজনে বহুজন হওয়া, মাটিতে ডুব দেওয়া ইত্যাদি ঋদ্ধি, অপরের মনোভাব জানিয়া ধর্মপ্রচারাদি আদেশনা, বুদ্ধগণের নিত্য চিন্তিত ধর্মদেশনা দ্বারা শাসনাদি অনুশাসনী এই তিনটি প্রতিহার্যে ভগবান বুদ্ধ অভ্যস্ত ছিলেন। কাজেই তিনি সর্ব-রত্নময় চঙ্ক্রমণ নির্মাণকার্য ঋদ্ধিবলে সমাপন করিয়াছিলেন।
১২. দশ সহস্র চক্রবালের সিনেরু মহাপর্বতসমূহকে রত্নময় স্তম্ভের ন্যায় করিয়া অনুক্রমে দেখাইয়াছিলেন। পদচারণ করিয়া ভাবনা করিবার জন্য নির্মিত স্থানকে চঙ্ক্রমণ বলে। ভগবান তাহা দশ সহস্র পৃথিবীতে দশ সহস্র সুমেরু পর্বতের উপর নির্মাণ করিয়াছিলেন। সেই সর্বশ্রেষ্ঠ সুমেরুসমূহ দেখিতে রত্নময় স্তম্ভের ন্যায় বোধ হইয়াছিল।
১৩. পঞ্চমারজিৎ জিন দশ সহস্র চক্রবাল অতিক্রম করিয়া রত্নময় চঙ্ক্রমণ নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহার উভয় পার্শ্বস্থ ভূমি সম্পূর্ণ সুবর্ণময় ছিল। ইহার মধ্যস্থল মণিময় বলিয়া জ্ঞাতব্য।
১৪. সেই চঙ্ক্রমণের তুলা ও সঙ্ঘাটিকাসমূহ অনুরূপ বহুবিধ রত্নখচিত এবং উভয় পার্শ্বস্থ বেদী সকল সুবর্ণের দ্বারা নির্মিত হইয়াছিল।
১৫. মণি-মুক্তার কণিকাকীর্ণ সুনির্মিত রত্ন-চঙ্ক্রমণ সমুদিত তপনের ন্যায় সর্বদিক উদ্ভাসিত করিয়াছিল।
১৬. ধীরতাগুণযুক্ত দ্বাত্রিংশৎ শ্রেষ্ঠ লক্ষণ সুশোভিত পঞ্চমারজিৎ সম্যকসম্বুদ্ধ সেই চঙ্ক্রমণে শোভমান হইয়া চঙ্ক্রমণ করিয়াছিলেন।
১৭. সমাগত দেবতারা দিব্য মন্দার, পদ্ম ও পারিজাত পুষ্প চঙ্ক্রমণে বর্ষণ করে।
১৮. সানন্দচিত্ত দশ সহস্র চক্রবালবাসী দেবসংঘ ভগবান বুদ্ধকে দর্শন করিয়া হৃষ্ট, তুষ্ট ও প্রমোদিত চিত্তে অভিবাদন করিতে করিতে নিপতিত হয়।
১৯. তাবতিংস, যাম, তুষিত, নির্মাণরতি ও বশবর্তী দেবলোকবাসী দেবগণ প্রহৃষ্ট চিত্তে অতীব সন্তোষের সহিত লোকনায়ক বুদ্ধকে দর্শন করিতে থাকে।
২০. দেবতা, গন্ধর্ব, মনুষ্য, যক্ষ, নাগ, সুপর্ণ এবং রাক্ষসেরাও জগতের হিতাকাঙ্ক্ষী লোকনাথ বুদ্ধকে আকাশে সমুদিত চন্দ্রম-লের ন্যায় দেখিতে লাগিল।
২১. পরিত্তাভ, অপ্পমাণাভ ও আভস্সরাদি দ্বিতীয় ধ্যানভূমিবাসী; পরিত্তসুভ, অপ্পমাণসুভ ও সুভকিন্নাদি তৃতীয় ধ্যানভূমিবাসী; এবং বেহপ্ফল, অবিহ, অতপ্পা, সুদস্সা, সুদস্সী ও অকনিট্ঠাদি শুদ্ধবাস ভুবনের ব্রহ্মগণ অতিশয় পরিশুদ্ধ শ্বেতবস্ত্র পরিধান করিয়া করজোড়ে দাঁড়াইয়া রহিলেন।
২২. অহো! বুদ্ধ জগতের কতই হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। সেই সময় দেবতারা পঞ্চবর্ণের কুসুম ও চন্দন-চূর্ণমিশ্রিত মন্দারপুষ্প বর্ষণ করিয়াছিল। আর আকাশে বস্ত্রসমূহ উড়াইয়া আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিল।
চঙ্ক্রমণ
নির্মাণ প্রাণালি সমাপ্ত।
